জেনে বুঝেই আমি গণসাধারণের সম্পত্তির ওপর আমার ব্যক্তিগত স্থাপনাগুলো গ’ড়ে তুলেছিলাম। সরকারি জমির ওপর দখলদারী খাটানোর জন্যে বিনিময়ে জনরাজস্ব ভাণ্ডারে কিছু দেইনি কিম্বা গণসরকারের কাছ থেকে ঐ জায়গাটুকু কিনেও নেইনি, বরং প্রকাশ্য গোপনে জনগণের কতক প্রতিনিধিকে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু বেতনভোগী চাকরকে ব্যক্তিগতভাবে সন্তুষ্ট রেখে রেখে আমার ব্যক্তিগত ব্যবসাকর্মগুলো চালিয়ে গেছি।
আজ যখন আমি গণসাধারণের জায়গা খালি ক’রে দিতে বাধ্য হচ্ছি, আমার ব্যক্তিগত ক্ষতিতে জনগণ আনন্দ পাচ্ছে দেখে মোটেও অবাক হইনি।
কিন্তু, আমার অবৈধ নড়বড়ে অস্থায়ী ডেরা-ডালা গুড়িয়ে দিলেই যে বিধানবৈধ কোনো ভালো কাজ করা হলো কিম্বা নোংরা পরিবেশে স্বস্তি ফিরে এলো এমন হাস্যকর ধারণা নিয়ে উন্মত্ত থাকলে বর্তমান জনগোষ্ঠীকেই প্রজন্মান্তরে আগামীতে যন্ত্রণার ঘানি টানতে হবে।
অন্যের ব্যাপারে জানি না, তবে নিজের ক্ষেত্রে বলতে পারি যে, আমাকে দিয়ে করিয়ে নেওয়া যায় এমন কোনো বৈধ কাজ থাকলে অর্থের বিনিময়ে তা ক’রে দিতে আমার কোনো মানহানী ঘটে না, আগেও ঘটেনি।
সকল শ্রমই সমান মর্যাদার -এই জ্ঞান আমি জীবন থেকে পেয়েছি। আমার কিশোরকালে বাম পায়ের বুড়ো আঙ্গুলের নখের কোণা যখন দেবে গিয়ে পেকে গ্যালো, দাক্তার পা ধরেছিলো, -আমার পা ধ’রে কেটে চিড়ে পুঁজ বের ক’রে ধুয়ে মুছে সাফ ক’রে দিয়েছিলো। পেশাজীবী ঐ চিকিৎসাকর্মীর মর্যাদা মোটেও কমেনি। আমি আজও তাকে শ্রদ্ধা করি। শুধু আমার পরিবার নয়, অনেকেই ঐ দাক্তারকে শ্রদ্ধা করে। বাস্তব জ্ঞান পাওয়ার পর থেকে কোনো বৈধ কাজকেই আমি আর তুচ্ছ মনে করতে পারি না।
ভিক্ষাবৃত্তি আমার কাছে ঘৃণ্য। চোরের চেয়েও ভিক্ষুক নোংরা। আমি জানি, ভিক্ষাদাতার রক্ষিতা হওয়াকেই বরং যেকোনো স্তরের ভিখারির স্ত্রী সৌভাগ্য মনে করে। আমি ভিখারি হ’তে চাই না। চাই না করুণা কিম্বা দান পেতে, আমি চাই প্রতিদান সসম্মানে। সুস্থভাবে বেঁচে থাকার বিনিময়ে বৈধভাবে কিছু করার সুযোগ না-পেয়ে কেউ অন্যকিছু করলে তখন আবারও জনগণ সেটাকে অবৈধ বলবে কি-না তা নিয়ে আমার পোষ্যরা হয়তোবা এখন আমাকে ভেবে দেখারও সময়টুকু দেবে না। তবে রপ্তানিনীতিটা যদি সঠিক থাকতো, এদেশের মাটিতে এমন অনেক কিছুই ফলে, বিশ্ববাজারে যথেষ্ট চাহিদাও আছে, আমাকে সসম্মানে ন্যায্য মজুরী দিয়ে উৎপাদন কাজে ডেকে ডেকে নেওয়া হতো।
অপসারণের আগে বিকল্প কর্মসংস্থানের চিন্তা এজন্যেই প্রগতির ক্ষেত্রে জরুরি যে, -রাস্তায় কোনো নষ্ট সেতু বা পুল অপসারণ কিম্বা মেরামতের আগেই ঐ নষ্টের পাশ দিয়ে একটা সাময়িক বাঁকা বিকল্প পথ বানানোর প্রচলন যারা করেছিলো , তাদেরকে আজও উন্মাদের তালিকাভুক্ত করা হয় না।
ব্যবসায়ী বুদ্ধি আমার জন্য সহায়ক হ’লে, তেমন সফলতা পাই বা না-পাই, আজ আমার অন্তত এমন দশা হতো না। আমাকে যেখান থেকে স’রে যেতে হচ্ছে,-কেউ যদি এভাবে বলে তো বেশি বলা হবে না,-জীবিকার জন্য বৈধ কর্মসংস্থান থাকলে, এমন দূষিত নর্দমার পাশে সীসাবিষাক্ত বাতাসে স্বেচ্ছায় আসতাম কি-না, যেখানে জীবিকার জন্য এর-ঠেলা-ওর-গুতা-তার-প্যাদানি সহ্য করতে হয়, -প্রস্রাব করতেও আসতাম কি-না যথেষ্ট সন্দেহ আছে।
আমার পক্ষে আত্মহত্যা করা সম্ভব নয়। কিছু অভিজাত-ভিখারি সৃষ্টির সহায়ক ছিলো আমার পূর্বসুরীরা। এখানে তারা তাদের প্রতিনিধিদের কর্মকাণ্ডের হিসাব না-নিয়ে বরং ওদেরকে নিজেদের তুচ্ছ ব্যক্তিগত কোন্দলের সালিশি-সভার কাজে ব্যস্ত রেখেছিলো। আমার পূর্বপুরুষ তাদের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্যের হিসেবটা সঠিকভাবে আদায় ক’রে নিলে তাদের আবাস-ভূখণ্ডটা ত্রাণনির্ভর হতো না, প্রত্যেকে তার যোগ্য কাজটা পেতো এবং আমার আজকের অপদস্থ দশাও কাউকে উন্মত্তের আনন্দ দিতো না।
পূর্বসুরীর ভুলের খেসারত না-দিয়ে পালিয়ে যাওয়া খুব একটা কঠিন কাজ ছিলো না আমার জন্য। আত্মহত্যা মহাপাপ না-হয়ে যদি মহাপূণ্য হতো, তবুও তা অর্জন করা এখন আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার অবস্থানে থেকে সামান্য একটা ক্ষুদ্র পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিলেও যে এমন মহাফাঁদে পড়তে হয়, আগে জানলে সংসারে না-ঢুকে সন্ন্যাস-সাধনায় সাধ্যমতো চেষ্টা চালাতাম।
আত্মহত্যার পক্ষে আমার জোরালো অজুহাত আছে। পূর্বপুরুষের ভুলের তুলনায় আজ আমার আত্মহত্যায় পাপের পরিমাণ খুবই নগণ্য, কিন্তু দায়িত্ব এড়ানোর অপরাধ থেকে মুক্তি পাবার যুক্তি এখনো জোগাড় করতে পারিনি। পরিবারকে ফাঁকি দিয়ে আত্মহত্যা করা যাচ্ছে না, তবে, অন্য কেউ আমাকে হত্যা ক’রে যদি আমার দায়মুক্তির পথ খুলে দেয় তো সেটা হবে ভিন্ন ঘটনা।
যাদের ভরণ-পোষণ আমার উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল, আমার নির্দেশ মানতে তারা বাধ্য; আমার বিশ্বাস আমি বললে তারা শুনবে; আমি সন্তানদেরকে বললে তারা অন্য যেকোনোজনকে বাবা হিসেবে মেনে নেবে। যাকে তারা পিতা বলে ডাকবে, সে যেন তাদেরকে নিজের সন্তান হিসেবে মেনে নিয়ে তাদের জন্য ব্যয় করে; সে যেন তার বৈধ উপার্জন থেকে তাদের ভরণ-পোষণের দায়ভার বহন করে। - বিধানের এ প্রস্তাবটা গ্রহণ করা হ’লে অবৈধ স্থাপনার উপার্জনের যন্ত্রণা থেকে জনগণ মুক্তি পাবে এবং হয়তোবা সেই সাথে মহান পিতৃত্ব অর্জন করতে আগ্রহী কেউ এগিয়ে এসে বোঝা টেনে টেনে যদি এমন আরো অনেক উদ্বাস্তু সন্তানের একটা সমষ্টিকে ভিন্ন কোনো সভ্য জাতিরূপে প্রকাশিত হ’তে সাহায্য করে তো, আগামীতে ঐ সচেতন জাতিটা তাকে জাতির পিতা হিসেবে গণ্য করতে পেরে নিজেই ধন্য হবে।
রঙ্গপুর-২৭/০১/০৭ ইং
[ উদ্বাস্তু হারাটিয়া কবিরাজের রোজনামচা থেকে খসে পড়া পাতাটি প্রগতির হাওয়ায় ভাসে ]
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন